মেধা নাকি শ্রম?- তিন কন্যার গল্প

মেধা নাকি শ্রম?- তিন কন্যার গল্প

Avatar of dabapath
| 1

গবেষণা সাধারণত করা হয় উপযুক্ত ব্যক্তির উপর। কিন্তু নিজের উদ্ভট থিওরীকে প্রমান করার জন্যে নিজের মেয়েদের উপরই গবেষণা চালানোর নজির পৃথিবীতে খুব কমই আছে। তেমনি এক গল্প।


গত শতকের মাঝামাঝি সময়। হাঙ্গেরিয়ান এক মনোবিজ্ঞানের শিক্ষক ভিন্নরকম এক তত্ত্ব প্রচার করতে শুরু করলেন। তিনি বললেন- মেধা জন্মগতভাবে প্রাপ্ত কোন জিনিস নয়। মেধা হল পরিশ্রম করে অর্জনের জিনিস। তিনি আরও বলেন প্রতিটি শিশুই অসামান্য মেধা নিয়ে জন্মায়। সমাজ যদি সেই মেধাকে বিকশিত করতে পারে তবেই কেবল তা প্রকাশ পায়। তিনি তাঁর তত্ত্ব প্রমানের জন্যে প্রথমে সরকারের কাছে গবেষণার আবেদন করেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা তাঁকে পাগল বলে গণ্য করেন এবং মানসিক হাসপাতালে ভর্তি হবার পরামর্শ দেন।


এই পাগলাটে লোকটির নাম লাজলো পোলগার। এত তিরস্কার সত্ত্বেও তিনি থেমে যান নি। সিদ্ধান্ত নেন নিজের সন্তানের উপর তিনি এই পরীক্ষা করবেন। কিন্তু তখনো যে তাঁর বিয়ে করা বাকি! ফলে তিনি তাঁর গবেষণার কথা জানিয়ে বিভিন্ন নারীকে চিঠি লিখতে থাকেন। অনুমেয় যে প্রায় সকলের কাছেই তিনি পাগল বলে গণ্য হন। অবশেষে ক্লারা নামে ইউক্রেনিয়ান এক নারী তাঁর প্রস্তাবে সাড়া দেন। খুব দ্রুত তাঁরা বিয়ে সম্পন্ন করেন।


বিয়ের পর ১৯৬৯ সালে তাদের প্রথম মেয়ে সুজান পোলগারের জন্ম হয়। লাজলো এবং ক্লারা ভাবতে থাকেন কিভাবে তাদের গবেষণা শুরু করা যায়। মেয়েকে আর্টিস্ট বানাবেন? না, তা কী করে হয়? মেয়ে ভাল আর্টিস্ট হলে মানুষ তখন বলবে মেয়ের মধ্যে ছবি আঁকার মেধা জন্মগতভাবেই লুকিয়ে ছিল। সুতরাং এমন কিছু দরকার যেখানে প্রতিযোগিতা, শৈল্পিকতা, চিন্তাশক্তি, উদ্ভাবনী দক্ষতা সব কিছুর সংমিশ্রণ রয়েছে। তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন মেয়েকে দাবাড়ু বানাবেন। শুরু হয় মেয়ের দাবা প্রশিক্ষণ! বাবা লাজলো পোলগার নিজেই মেয়েকে কোচিং করানো শুরু করেন।


কিছুদিন পর ১৯৭৪ সালে তাদের দ্বিতীয় মেয়ে সোফিয়া পোলগার জন্ম নেয়। তার দু’বছর পর তাদের তৃতীয় মেয়ে জুদিথ পোলগারের জন্ম হয়। বাবা-মা সিদ্ধান্ত নেয় বাকি দুই মেয়ের উপরও একই গবেষণা চলবে। তাদেরকেও দাবা শিখানো হয়। সুজানকে দাবা শেখানো হয়েছিল কথা বলতে শেখার সাথে সাথেই। অর্থাৎ ৩ বছর বয়স থেকে। চার বছর বয়সেই সুজান বেশ ভাল দাবা খেলতে পারত। তবে সিদ্ধান্ত হয় বাকি দু’জনকে দাবা খেলতে তাদের ৫ বছর বয়স পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।


বড়বোন সুজান পোলগার বাসায় আলাদা কক্ষে তাঁর বাবার সাথে দাবা প্র্যাকটিস করতেন। এদিকে বাকি দুই বোনের আগ্রহের শেষ নেই। কিন্তু বড়বোনের কক্ষে প্রবেশ নিষেধ! শর্ত হল আগে দাবা খেলা শিখতে হবে, তারপর ঐ কক্ষে প্রবেশ করা যাবে। সোফিয়া এবং জুদিথ অল্প সময়ে দাবা খেলা রপ্ত করে ফেলেন। তারপর শুরু হয় তিন বোনের একত্রে কোচিং। বাবা লাজলো পোলগার নিজে মেয়েদেরকে শত শত ঘণ্টা দাবা প্র্যাকটিস করান। অতঃপর তার গবেষণার ফলাফলের জন্যে অপেক্ষা করতে থাকেন।


গবেষণার ফলাফল:


সুজানের বয়স যখন ৫ বছর তখন তাঁর বাবা তাঁকে স্থানীয় একটা টুর্নামেন্টে খেলতে নিয়ে যান। অংশগ্রহনকারী সকলের বয়স ছিল ১০-১২ বছর বা তার অধিক। টুর্নামেন্টে একটি খেলাতেও না হেরে সুজান ১০-০ স্কোর নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হন! সারা হাঙ্গেরিতে চাইল্ড প্রোডিজি হিসেবে সুজানকে নিয়ে খবর ছাপা হয়। মাত্র ১২ বছর বয়সে সুজান আন্ডার-১৬ দাবা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হন। ১৪ বছর বয়সে সুজান ছিল বিশ্বের সবচেয়ে টপ রেটেড মহিলা দাবাড়ু! ১৯৯১ সালে গ্র্যান্ডমাস্টার টাইটেল জেতেন। সুজান ৪ বার মহিলা দাবা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হন এবং পাঁচবার দাবা অলিম্পিকে চ্যাম্পিয়ন হন।


মেজবোন সোফিয়া দাবায় গার্লস আন্ডার-১৪ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হন। সোফিয়ার সবচেয়ে বড় পারফর্মেন্সকে “স্যাক অব রোম” বলা হয়। সোফিয়া তখন মাত্র ১৪ বছর বয়সী। সোফিয়া ১০ জন শক্তিশালী গ্র্যান্ডমাস্টারকে পরপর পরাজিত করে। তাঁর এই পারফর্মেন্সকে তখনকার বিবেচনায় দাবার সর্বকালের সেরা ৫ম পারফর্মেন্স ধরা হয়।


সবশেষে জুডিথ পোলগার! যারা দাবা খেলেন তাঁরা সবাই কমবেশী জুডিথেরর নাম শুনেছেন। দাবা কিংবদন্তী ববি ফিশার মেয়েদের দাবা নিয়ে বলেছিলেন যেকোন মেয়ের বিপক্ষে তিনি একটা ঘোড়া কম নিয়ে খেলেও জিততে পারবেন। যাহোক ফিশারের সাথে পোলগারের দাবা বোর্ডে সাক্ষাৎ হয়নি। কারণ ফিশার তখন অজ্ঞাত কারণে দাবা থেকে বিচ্ছিন্ন এবং পলাতক। কিন্তু ফিশারকে তিনি জবাব দিয়েছেন ভিন্নভাবে। পোলগার গ্র্যান্ডমাস্টার হন মাত্র ১৫ বছর বয়সে যা ঐসময় পর্যন্ত নারী পুরুষ নির্বিশেষে সর্বকনিষ্ঠ ছিল এবং তা ফিশারের রেকর্ড ভেঙ্গেছিল!


জুডিথ টানা প্রায় ১২ বছর বিশ্বের এক নম্বর মহিলা দাবাড়ু ছিলেন। অসংখ্যবার মহিলা বিশ্বকাপ এবং অলিম্পিয়াড জিতেছেন। জুডিথ তাঁর সময়ে যতজন বিশ্বচ্যম্পিয়ন পুরুষ দাবাড়ু ছিলেন সকলকে একবার হলেও পরাজিত করেছে। জুডিথ তাঁর ক্যারিয়ারে ১১ জন দাবা বিশ্বজয়ীর সাথে বোর্ডে মুখোমুখি হন এবং তাদের পরাজিত করেন। এদের মধ্যে গ্যারি ক্যাস্পারভ, বিশ্বনাথান আনান্দ, এনাতলি কার্পভ, ক্রামনিকের মত খেলোয়াড়েরা রয়েছেন!


তিন বোন কি একসাথে কোনদিন খেলেননি? হ্যাঁ, অবশ্যই। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনাটি হল ১৯৮৮ সালের গ্রিস চেস অলিম্পিয়াড। তিন বোনই ছিলেন হাঙ্গেরি মহিলা জাতীয় দলের খেলোয়াড়। টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই তাঁরা মিডিয়ার নজরে ছিলেন। জুডিথের বয়স তখন মাত্র ১২। তিন বোন একের পর এক জিততে থাকেন। সবশেষে ফাইনালে প্রতিপক্ষ সোভিয়েত ইউনিয়ন। দাবায় সোভিয়েত ইউনিয়ন মানেই আতঙ্কের নাম! টানা ৩০ বছর ধরে তাঁরা চ্যাম্পিয়ন। কিন্তু তিন বোন মিলে একদম অবিশ্বাস্য কান্ডটিই করে বসলেন। টানা ৩০ বছর ধরে অপরাজিত সোভিয়েত মহিলা দাবা টিম অবশেষে তিন বোনের কাছে পরাজিত হল। প্রথমবার চেস অলিম্পিয়াডে গোল্ড মেডেল জেতে হাঙ্গেরি!


মেধা অর্থহীন যদি সেখানে শ্রম না থাকে। প্রতিটি বিজ্ঞানী, দার্শনিক, লেখক কিংবা সফল মানুষ তৈরি হয় অসামান্য পরিশ্রম থেকে। হোক শারীরিক কিংবা মানসিক। লাজলো পোলগারের পাগলাটে গবেষণা আমাদের তারই প্রমান দেয়।


- রিফাত আহমেদ, সিনিয়র কন্টেন্ট রাইটার, দাবাপাঠ