Niaz Morshed South Asian First Grandmaster
বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে বিরল এক প্রতিভার নাম উপমহাদেশের প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার নিয়াজ মোর্শেদ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর আন্তর্জাতিকভাবে ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান এই প্রতিভাবান দাবারু। বাংলাদেশের দাবা খেলা খুব এক জনপ্রিয় না হলেও নিয়াজ মোর্শেদ কে চেনেনা এমন সংখ্যা হাতে গোনা গুটি কয়েক হলেও বা হতে পারে। দেশের ক্রীড়াঙ্গনে প্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি তার হাত ধরেই আসে । 
১৩ মে ১৯৬৬ সালে মঞ্জুর মোর্শেদ এবং নাজমা আহমেদের সন্তান নিয়াজ ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। খুব ছোটবেলা থেকেই দাবার প্রতি তার গভীর ভালোবাসা জন্মে। প্রতিবেশী ও তৎকালীন জাতীয় চ্যাম্পিয়ন জামিলুর রহমানও তাকে দাবা শিক্ষার উপযোগী সকল বিষয়ে অবগত করেন । নিয়াজ মোর্শেদ নয় বছর বয়সে জাতীয় দাবা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। 
যদিও ঐ প্রতিযোগিতায় প্রাথমিক পর্ব অতিক্রম করতে পারেননি, তবুও তিনি উপস্থিত সকলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন ও দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ১২ বছর বয়সেই তিনি বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় দাবাড়ুদের একজনে পরিণত হন। ১৯৭৮ সালে জাতীয় দাবা প্রতিযোগিতা তিনি যৌথভাবে প্রথম হলেও টাইব্রেকারে তৃতীয় হন। পরবর্তীতে ১৯৭৯ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত একাধারে ৪ বছর জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হন। পরবর্তীতে প্রতিযোগিতায় একক অধিপত্য থাকার কারণে সে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে কিছু বছর অংশগ্রহণ হতে বিরত থাকে।
Young Niaz Morshed
১৯৭৯ সালে ভারতের কোলকাতায় প্রথম বারের মতো যে-কোন পর্যায়ের আন্তর্জাতিক দাবা প্রতিযোগিতায় নিয়াজ অংশ নেন। ‘৮১-তে ঢাকায় অনুষ্ঠিত এশিয়ান জুনিয়র চ্যাম্পিয়নশীপে যুগ্মভাবে প্রথম হলেও টাইব্রেকে দ্বিতীয় হন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজায় অনুষ্ঠিত আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায়ও তিনি দ্বিতীয় হন। ঐ বছরই আন্তর্জাতিক মাস্টার-এর নর্ম (উপাধি) অর্জন করেন। নিয়াজ মোর্শেদ গ্র্যান্ডমাস্টারের ১ম নর্ম অর্জন করেন ১৯৮৪ সালে সাবেক যুগোস্লাভিয়ায় অনুষ্ঠিত বেলা ক্রোভা ওপেনে। তিনি ২য় নর্ম অর্জন করেন ১৯৮৬ সালে। ধারাবাহিকভাবে সাফল্য অর্জন করেন ‘৮৫-তে ঢাকায় আয়োজিত ক্যাপস্টেন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট ও ‘৮৬-তে কোলকাতা গ্র্যান্ড মাস্টার্স টুর্নামেন্টে। ১৯৮৭ সালে বিশ্ব দাবা সংস্থা (ফিদে) নিয়াজ মোর্শেদকে মাত্র ২১ বছর বয়সে গ্র্যান্ড মাস্টারের মর্যাদা দেয় যা তাকে বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম গ্র্যান্ড মাস্টার এবং এশিয়ার ৫ম গ্র্যান্ড মাস্টার হিসেবে খ্যাতি প্রদান করে। তিনি বার্মা থেকে তুরস্ক পর্যন্ত অঞ্চল নিয়ে বিশ্ব দাবা সংস্থার নবম আঞ্চলিক জোনের প্রথম গ্র্যান্ড মাস্টার। গ্র্যান্ড মাস্টারের খেতাব অর্জনের পর নিয়াজ মোর্শেদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ার পেনসালভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়-এ অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করেন। ঐ সময়ে তিনি কেবল কাছাকাছি থাকা প্রতিযোগিতাগুলোয় অংশ নেন। বলা যায় প্রফেশনাল দাবা থেকে কিছুটা ছিটকে পড়েন। স্নাতক ডিগ্রী অর্জনের পর নিয়াজ পুনরায় দাবা খেলায় মনোনিবেশ করেন। ২০০৩ সালে পুনরায় মনোনিবেশ করেন। তখন গ্র্যান্ড মাস্টার জিয়া গ্র্যান্ড মাস্টার রিফাত সহ নতুন প্রজন্মের অনেক শক্তিশালী দাবাড়ু তৈরি হয়ে যায়। তরুণ প্রজন্মের দাবাড়ুদের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হয়েও ’৯১-এ ভারতের গোডরিকে চ্যাম্পিয়ন , ‘৯২-এ ফিলিপাইনের সেবু’তে গ্র্যান্ড মাস্টার টুর্নামেন্টে রানার্সআপ ‘৯৩-এ কাতারের দোহা দাবা উৎসবে দ্বিতীয় রানার ‘৯৩-এ আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন এবং ২০০৪ সালের কমনওয়েলথ দাবা প্রতিযোগিতায় টাইব্রেকারে রানার্সআপ হন।খেলাধুলার পাশাপাশি নানা প্রতিভার অধিকারী তিনি ১৯৯৪ সালে তিনি নিজের সংগীত অ্যালবাম 'অথচ একদিন 'প্রকাশ করে। সাম্প্রতিক সময় তার নিজের কথা ও সুর করা দারুন কিছু মিউজিক ভিডিও ইউটিউবে প্রকাশ করে। নিয়াজ মোর্শেদ কবিতা ও লিখেন। নিয়াজ মোর্শেদ ৬ বার বাংলাদেশ জাতীয় দাবায় চ্যাম্পিয়ন হবার গৌরব অর্জন করেন । বাংলাদেশের হয়ে বহুবার বিশ্বকাপ দাবা ও অলিম্পিয়াড দাবায় প্রতিনিধিত্ব করেন। ক্রীড়াঙ্গনে অসামান্য অবদান রাখা ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারে ভূষিত হন।
